Wednesday, August 17, 2016

কালান্তর



কালান্তর
তীর্থ চৌধুরী



দূরে সরে যাচ্ছে!
মুহূর্তগুলো স্মৃতির পুরনো আলমারিতে হারিয়ে যাচ্ছে
আঁকিবুকি কাটা শৈশবের আঁকার খাতার মতন,
পুরনো অ্যালবামের সাদা কালো ঝাপসা ছবির মতন ।


চলে যাচ্ছে শৈশব, চলে যাচ্ছে কৈশোর, চলে যাচ্ছে যৌবন
পরে থাকছে ক্ষনিক মুহূর্ত, যা মনের ভিতরে খুঁজছে আশ্রয়
যা সময়ের চাপে হারাচ্ছে গুরুত্ব, তার ঘটছে পরাজয় ।


দূরে সরে যাচ্ছে!
মানুষ, পদার্থ, কৃত্রিম-অকৃত্রিম, আদর, হিংসা
সত্য-মিথ্যে, আদর্শ-অনাদর্শ, বিষয়, বাসনা
কিছুই মনে নেই, কিছুই মনে থাকেনা, তাই কিচ্ছু যায় আসে না ।


কাল হয়েছে আজ, আজ হবে কাল, রইবে শুধু ‘আমি’-রা
আমার কথা বলব কাকে, আকাশ-চন্দ্র-সূর্য-তারা?
ওদের কাছেও ‘আমি’ নিরর্থক, অনাবশ্যক লক্ষ্মীছাড়া!

  
আমার আমিরও হতে হবে ক্ষয়, পরে থাকবে টুকরো স্মৃতি
সেও অগোচরে ঝরে যাবে কবে, হয়ে যাবে কবিতা এমনি ।

ভয়

ভয়
তীর্থ চৌধুরী

কাল মহালয়া । দেবীপক্ষের সূচনা ।

সঞ্জয় আর পাঁচটা প্রবাসী বাঙালীর মতই কলকাতার দুর্গাপুজো দেখা থেকে চিরকাল বঞ্চিত । ছোটবেলা থেকেই মা বাবার কাছে গল্প শোনা, কিন্তু স্বচক্ষে দেখার সৌভাগ্য কখনও ওর হয়নি। সঞ্জয়ের বাবা ওর জন্মের পূর্বেই রাঁচিতে আসেন কোল মাইন্সের কাজ নিয়ে । সেই থেকেই ওদের রাঁচিতে থাকা । কলকাতায় আত্মীয়-স্বজন সেরকম বিশেষ না থাকায়, ওদের কখনও খুব একটা কলকাতায় আসা হয়নি পুজোর সময় । ছোটবেলা থেকেই মা এর কাছে গল্প শুনে সঞ্জয় যেন দুধের স্বাদ ঘোলে মিটিয়েছে । তাই ‘টাইমস্‌ ওফ্‌ ইন্ডিয়া’ র চাকরিটা যখন ওর হাতে এল, এই সুযোগটা সঞ্জয় আর ছাড়তে পারেনি । সবে পাঁচ দিন হল ও কলকাতায় এসেছে, আর কি কপাল, তাও একদম পুজোর মরসুমেই ।
**********************

এসব তো খুব ভালো কথা, কিন্তু সঞ্জয় আজ যখন জানলার ধারে বসে রাস্তার দিকে চেয়ে আছে, ওর মাথায় কিন্তু একদম অন্য কিছু ঘুরছে । পুজোর আনন্দ যেন কোথায় হারিয়ে গেছে । মুখে যেন এক অদ্ভুত অশান্তির ছায়া । কাউকে সঞ্জয় বলতে পারছে না ওর উদ্বিগ্ন মনের কথা । এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে শুধু রাস্তার দিকে ।

বালিশের তলায় ফোন্‌টা অনেকক্ষণ ধরে বেজে চলেছে । সঞ্জয় যেন শুনতে পেয়েও শুনছে না । কানে আওয়াজ পৌঁছল কিন্তু তাতেও মন দিল না । কিছুক্ষণ পর ওর মনে হল বোধহয় ওর মা ফোন করছেন । বালিশের তলা থেকে ফোনটা নিয়ে জানলার পাশে দাঁড়াল । মোবাইলের দিকে তাকাতেই নজরে পড়ল ওর মা সাতবার কল করেছেন গত এক ঘন্টার মধ্যে । ছেলের জন্যে স্বাভাবিক ভাবে উনি চিন্তিত, কখনও ছেলেকে ছেড়ে বাড়িতে থাকেননি তো ।

কিছুক্ষণ থমকে থেকে মাকে কল করল সঞ্জয়।

“হ্যালো মা”

“কি রে তোকে কখন থেকে ফোন করছি, কোথায় ছিলি? একবারও ফোন তুলছিলি না কেন?”

“হুঁ”

“আমার কত চিন্তা হয় জানিস তো? একবার ফোন তুলে বললেই পারিস যে বন্ধুদের সঙ্গে বেরিয়েছিস“

“হুঁ”

“তুই বল । তোর তো বয়স কম হল না, একটু তো কান্ডজ্ঞ্যান থাকা উচিত“

“হুঁ”

এই! হুঁ হুঁ কি লাগিয়েছিস বলত? কিছু বলবি তো?”

“বল শুনছি!”

“শুনছি মানে? কালকে মহালয়া। মোবাইলে অ্যালার্ম লাগিয়েছিস? আজকাল তো আর কেউ রেডিও চালায় না, শুনেছি নাকি সিডি, ডিভিডি অনেক কিছু বেরিয়েছে। আর তোদের ওটাকে কি যেন বলে? ওই যে যেখানে সব গান শোনা যায় ল্যাপটপে? সেখানেও নাকি শোনা যায় আজকাল । শুনিস কিন্তু সঞ্জু, ভালো লাগবে । দেবী আসছেন রে কাল! দুগ্‌গা দুগ্‌গা!”

“ঠিক আছে। শুনব। কখন অ্যালার্ম দেব?”

“কখন আবার কি? প্রতি বছর তো তুই লাগিয়ে দিস আমাদের জন্যে। চারটের সময় রে। এখন তাই তাড়াতাড়ি শুয়ে পর। আর রাত করিস না।”

“আচ্ছা মা? দেবীপক্ষ শুরু হলে কি আমাদের সব সমস্যা, সব চিন্তা দূর হয়ে যায়?”

“সমস্যা? কি ব্যাপার বলত? তোর গলা শুনে আমার কিন্তু কেমন লাগছে! ঠিক আছিস তো? আমার কাছ থেকে কিছু লুকোচ্ছিস না? আমি বলছিলাম কতবার! পুজোটা কাটিয়ে যা । তারপর কত করে বললাম একটা হোটেলে গিয়ে উঠিস! গিয়ে উঠলি একটা বন্ধুর বাড়ি।”

“কিছু হয়নি । চিন্তা কর না।”

“হ্যাঁ রে শোন? বাড়িটা কেমন রে? তুই একাই আছিস এখনও? কোন লোকজন নেই? তোর বন্ধুটা গেল কই?


“হ্যালো! শুনছিস? কি রে?”

পাশের ঘর থেকে একটা আওয়াজ সঞ্জয়ের চেহারা বদলে দিল। মুখের আদল আবার ভয়ভুক্ত হয়ে উঠল। ঠিক সেই আওয়াজ, ঘড়িতে চোখ পড়ল সঞ্জয়ের। রাত দশটা। ঠিক সেই সময়।

পাশের ঘরে কেউ নেই। এই বাড়িতে সঞ্জয় একাই থাকে। ওর বন্ধু ওকে কলকাতায় আসার আগে বলেছিল যে এই বাড়িতে সঞ্জয় ওর সঙ্গে থাকতে পারে । বন্ধু মানে ঋজু । ঋজু ওর ছোটবেলার বন্ধু । সঞ্জয়ের মা ওকে না চিনলেও, স্কুলে ওরা দুজনেই বহুদিন একসঙ্গে পড়াশোনা করেছে । তবে ঋজু তিন বছর আগেই কলকাতা চলে আসে চাকরি নিয়ে । কিন্তু এবার যখন সঞ্জয় কলকাতা এল, ঋজুর কোন খোঁজ ও পায়নি। বাড়ির ঠিকানা ওর কাছে ছিল । ঋজু বাড়ির চাবিটা প্রতিবেশীর কাছে দিয়ে গেছিল, বলে গেছিল যে কিছুদিন বাদেই ও ফিরে আসবে । কাজে বেরোচ্ছে । আজ প্রায় চার দিন হয়ে গেল, কিন্তু ওর কোন খবর নেই।

তবে ওই আওাজটা? ঠিক যেন কোন মানুষের গলার স্বর । এক আকুল কণ্ঠস্বর । যেন কিছু চাইছে । যেন খুব কষ্ট পাচ্ছে কেউ । আজ দুদিন হল সঞ্জয় ওই গলার স্বর ঠিক একই সময় শুনতে পাচ্ছে। গতকাল ও সাহস করে, ঘরে ঢুকেছিল । গিয়ে দেখে ওখানে কেউ নেই। আর আওয়াজটাও কিছুক্ষণ বাদে থেমে যায়। আজ আবার ফিরে এল সেই আওয়াজ!

সঞ্জয় ভাবল আর তো কিছু মুহূর্ত বাদেই মহালায়া। মা তো বলেছেই দেবী পক্ষের শুরুতে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়, সব দুঃখ কষ্ট মিটে যাবে। ভাবতে ভাবতেই সঞ্জয়ের চোখ পড়ল ফোনের ওপর। মায়ের ফোন আসছে আবার । সঞ্জয় কেটে দিল ফোন । আর ভালো লাগছে না সঞ্জয়ের । আওয়াজটা তো এমনিতেও কিছুক্ষণ বাদে থেমে যাবে । তার পরে কথা বললেই হল ।

কিন্তু আজ যেন অন্য কিছু অপেক্ষা করছিল সঞ্জয়ের জন্যে । সেই আর্তস্বর যখন থামল, এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটল । হঠাত্‌ সঞ্জয় লক্ষ করল বাইরের ঘরে আলো জ্বলছে । কেউ যেন এখনি সেই আলো জ্বালালো । দরজার তলা দিয়ে সঞ্জয় পরিস্কার আলো দেখতে পাচ্ছে । ঘরে তো কেউ নেই । তাহলে? কোন চোর কি? ভয়ে সঞ্জয়ের গলা শুকিয়ে এল । ঘড়িতে এখন এগারোটা । কোন আওয়াজ নেই, শুধু আলো জ্বলছে। ভয়ে সঞ্জয় বিছানার একটা কোনে গিয়ে বসে রইল । 

ভাবল মাকে একটা ফোন করবে । ফোনটা হাতে নিতেই সঞ্জয় দেখল কোন সিগনাল নেই । কিন্তু কিছুক্ষণ আগেই তো ও কথা বলল ওর মায়ের সঙ্গে। বোধহয় মায়ের ফোনটা ওঠানো উচিৎ ছিল ওর ।

সঞ্জয় প্রায় টানা দশ থেকে পনের মিনিট সেই দরজার দিকে নীচে তাকিয়ে ছিল । এক মুহূর্তের জন্যেও ও চোখ সরায়নি সেখান থেকে । মনে মনে ওপেক্ষা করছিল কখন এই রাত শেষ হবে । কখন মহালয়া হবে ভোরের সঙ্গে । এক হাতে ওর ফোন, আর অন্য হাতে নিজের ওয়ালেট, যেটাতে ওর মায়ের ছবি আছে ।

দেখতে দেখতে সময়ের ঘড়ি এগিয়ে চলল । রাত এখন বারোটা । সঞ্জয়ের নজর কিন্তু এখনও সেই দরজার দিকে । এইবার যা ঘটল তা সঞ্জয় জীবনেও ভাবতে পারেনি । দরজার ঠিক সামনে কারোর পায়ের ছায়া দেখতে পেল ও । ঘামে সঞ্জয়ের জামা ভিজে গেছে ইতিমধ্যে, গলা শুকিয়ে এসছে ওর । ধীরে ধীরে দরজাটা খুলে গেল । আর দরজার মধ্যিখান দিয়ে বেরিয়ে এল একটা হাত । একটা নরকঙ্কালের হাত । সে কী বীভৎস দৃশ্য! চিৎকার করে উঠল সঞ্জয়।

“মা গো বাঁচাও! কে ওখানে!!!”

ভয়ে সঞ্জয়ের মাথা ঘুরে গেল । ধীরে ধীরে ও নেতিয়ে পড়ল বিছানায় । পলকের মধ্যে জ্ঞ্যান হারালো সঞ্জয়।

                                               *****************************

ভোর তখন চারটে । পাশের বাড়িতে কেউ বোধহয় উঠে রেডিও চালিয়েছে। শোনা যাচ্ছে বীরেন্দ্র কৃষ্ণের স্তোত্রপাঠ । এই আওয়াজেই সঞ্জয়ের জ্ঞ্যান ফিরে এল। অন্ধকার থেকে হঠা যেন আলোর সন্ধান খুঁজে পেল সঞ্জয় । সঞ্জয়ের মুখে হাসি । মহালয়া হয়ে গিয়েছে । দেবী এসে গেছেন । এখন আর কোন ভয় নেই । শুয়ে শুয়ে রেডিওর গান শুনতে লাগল সঞ্জয় ।

হঠাৎ কি মনে হল, ওর চোখ পড়ল দরজার দিকে । দরজাটা এখন হাট করে খোলা । বাইরের ঘরে এখন আলো জ্বলছে ।

বিছানা ছেড়ে সঞ্জয় উঠে বসল । ভাবল এখন তো পুজো শুরু হয়ে গিয়েছে । এখন আর কি ভয়? তাড়াতাড়ি নিজেকে শক্ত করে ও এগিয়ে গেল দরজার দিকে । আজকে ও এই রহস্য সমাধান করবেই।
বাইরে ঘরে যেতেই ওর চোখ পড়ল সোফার দিকে। দেখল একটা ওর বয়সি ছেলে বসে রয়েছে মাথা নীচু করে। ডিম ল্যাম্পের আলোয় ঠিক বোঝা যাচ্ছে না ।

ছেলেটা ওর দিকে এবার মুখ তুলে চাইল ।

“এ কি তুই? ঋজু! তুই কখন এসেছিস? সে কি রে, তুই সারা রাত কি এই সোফাতেই শুয়েছিলি নাকি? আমি কাল সারা রাত ঘুমোতে পারিনি । কাল কি তুই বাড়ি ঢুকেছিলি রাতে? কি কান্ড!!! আমি তো একেবারে ভয়ে শুকিয়ে গেছিলাম রে!”

“ও তাই?”

“তুই ডাকবি তো আমাকে, ফালতু আমি এতো ভয় পেলাম!” হেসে বলল সঞ্জয় । “চল এবার ভেতরে চল, একটা সিগারেট খাই। কাল সারা রাত যা কেটেছে কি বলব তোকে।“

“না তুই এখানেই বস, ভেতরে আর যেতে হবে না”

“ভেতরে যেতে হবে না মানে? চল রে, আরাম করে বিছানায় বসে মহালয়া শুনব । তাড়াতাড়ি চল ।“
“সঞ্জু আমার কথা শোন, ভেতরে যাস না”, শান্ত গলায় উত্তর দিল ঋজু .

সঞ্জয়ের ঠিক ভালো ঠেকল না ঋজুর কথা । ঋজু ওকে কেন ভেতরে যেতে মানা করছে? আর ও এত ধীরে ধীরে কেন কথা বলছে? আর ভেতরে এমন কি আছে যে সঞ্জয়ের সেখানে যাওয়া বারণ?

কিছু তোয়াক্কা না করেই সঞ্জয় এবার ওর শোয়ার ঘরের ভিতরে ঢুকে এল । 

ভেতরে ঢুকে সঞ্জয় যা দেখল, তাতে ওর সমস্ত শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল । চিৎকার করে উঠল সঞ্জয় । মাটিতে বসে পড়ল ও। পিছন থেকে ঋজু এসে ওর কাঁধে হাত রাখল ।

সামনে বিছানার ওপর পড়ে রয়েছে একটা লাশ । সেটা সঞ্জয় নিজেই । নিস্তেজ হয়ে রয়েছে পুরো শরীর । লাশের এক হাতে ওয়ালেট আর অন্য হাতে মোবাইল ফোন । ফোনে প্রচুর মিসড্‌ কল । সঞ্জয়ের মায়ের ।

পিছন থেকে ঋজু বলে উঠল, “আজ দুদিন আগে বাইপাসের রাস্তায় আমার একটা ভয়াবহ অ্যাক্সিডেন্ট হয়। আমি সেখানেই প্রাণ হারাই । প্রায় দুঘণ্টা আমি রাস্তার ওপর পড়ে ছিলাম রে, কেউ সাহায্য করল না । শেষ সময়ে ভীষণ কষ্ট পেয়েছি রে আমি । অনেকবার কেঁদেছি রাস্তায় শুয়ে রক্তাত অবস্থায় । কেউ এল না রে । তিন্ দিন ধরে আমায় ওরা একটা মর্গে ফেলে রেখেছে রে । ভাবলাম কিছু ভাবে তোকে যদি বোঝাতে পারি আমার মৃত্যুর কথা তাহলে যদি একটু আমার বাড়িতে খবর দিস । আমার বাড়িতে এখনও কেউ জানেনা । তাই কাল রাতে আমি একবার বাড়ি এসেছিলাম একবার। কিন্তু আমি ভাবিনি তোর সঙ্গে এরকম হবে। আমি সারা রাত তাই সোফাতেই অপেক্ষা করেছি। আমায় ক্ষমা করে দিস তুই সঞ্জু!”

সঞ্জয়ের চোখে জল । কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না । ব্যাথায় ওর বুক ফেটে যাচ্ছে! ভাবল কাল রাতে যদি একবার ও মায়ের ফোনটা তুলে নিত!

বাইরে এদিকে ভোর হয়ে গিয়েছে ।

পিছনে গান শোনা যাচ্ছে, “জাগো, তুমি জাগো!”




Followers